অবস্থানঃ
জেলাঃ সিলেট উপজেলাঃ দক্ষিণ সুরমা গ্রামঃ জৈনপুর
ইতিহাস
সত্যযুগে দক্ষ রাজা কর্তৃক আয়োজিত যজ্ঞানানুষ্ঠানে দেবাদিদেব মহাদেব (দক্ষ রাজার জামাতা) কে নিমন্ত্রণ না করায় পতি নিন্দা সহ্য করতে না পেরে দক্ষ কন্যা সতীদেবী দেহত্যাগ করলে মহাদেব সেই সংবাদ শুনে মৃত সতীর দেহ কাঁধে নিয়ে প্রলয় নৃত্য শুরু করেছিলো। মহাদেবের প্রলয় নৃত্যে সৃষ্টি ধ্বংসের উপক্রম হলে ব্রক্ষ্মা ও দেবগন সৃষ্টি করার জন্য শ্রী বিষ্ণুর শরণাপন্ন হয়েছিলেন এবং শ্রী বিষ্ণু তাঁহার সুদর্শন চক্র দ্বারা মহাদেবের স্কন্ধে থাকা সতীদেহকে ৫১টি খন্ডে খন্ডিত করে ভূমিতে পতিত করেছিলেন ও মহাদেবকে ধ্বংসলীলা থেকে নিবৃত্ত করেন। সতী দেবীর ৫১টি দেহ খন্ড ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, তিব্বত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে পতিত হয়। এই ৫১টি দেহখন্ড যেসব স্থানে পতিত হয়েছিলো সেইসব স্থান এক একটি পীঠস্থান হিসেবে পরিণত হয়ে বিভিন্ন স্থানে পরিচিতি লাভ করে।
তন্ত্র শাস্ত্রে এই স্থান বলতে শ্রীহট্ট কে বোঝানো হয়েছে, তাইতো তন্ত্রে লিখিত আছে-
“গ্রীবা পপাত শ্রীহট্টে সর্বসিদ্ধি প্রদায়িনী ।
দেবীতত্র মহালক্ষ্মী সর্বনন্দশ্চ ভৈরব ।।”
সিলেট শহর হইতে ৩ কিলোমিটার দক্ষিণে সিলেট ফেঞ্চুগঞ্জ সড়কের পশ্চিম পাশ্বে জৈনপুর গ্রামে সত্যযেগের সেই দিনে সতীদেবীর ৫১টি দেহ খন্ডের একটি দেহাংশ গ্রীবা (গন্ডদেশের পেছন দিকটা, কন্ঠ নয়) পতিত হয়েছিলো। ফলে উক্ত স্থানটি “গ্রীবামহাপীঠ” নামে পরিচিতি লাভ করে। এখানে অধিষ্টাত্রী দেবীর নাম “শ্রী শ্রী মহালক্ষ্মী ভৈরবী” এবং অনতিদূরে ঈশান কোণে গোটাটিকর গ্রামে “সর্বানন্দ ভৈরব” নামে পীঠরক্ষী শিব মন্দির অবস্থিত। পুরান মতে, সতীর দেহের গ্রীবা অংশ এইস্থানে পতিত হয়েছিলো৷কথিত এই যে, দেবীর গ্রীবার পতন হয়েছিল একটি শিলার ওপর, এই শিলাই পূজিতা হতেন আদিকাল থেকে। এই পীঠ বহুকাল গুপ্ত ছিল। বাংলার দ্বাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতকের মাঝে এখানে রাস্তা নির্মাণের কাজ চলছিল। সে সময় দেবীপ্রসাদ দাশ নামক এক ব্যক্তি রাস্তার কাজের জন্য কিছু শ্রমিককে নিযুক্ত করেন। রাস্তা মেরামতের সময় মাটি খুড়লে একটি কালো শিলা বের হয়ে আসে। কিছুতেই সেই শিলাকে সড়ানো যাচ্ছিলো না। এক শ্রমিক শাবল দিয়ে শিলাকে দুখণ্ড করে দিলো এবং সাথে সাথে পাশের জঙ্গল থেকে একটি বালিকা বের হয়ে সেই শ্রমিক কে চড় মারলো এবং সকলকে হতবাক করে নিমিষে সেই বালিকা হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো।সেই রাত্রে দেবীপ্রসাদকে মা মহালক্ষ্মী স্বপ্নাদেশ দিয়ে বললেন- “তুই এই স্থানে আমাকে প্রতিষ্ঠা করে নিত্য পূজোর ব্যবস্থা কর।” ধনী দেবীপ্রসাদ লক্ষ ইট দিয়ে দেবীর মন্দির বানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন, কিন্তু পরদিন রাত্রে দেবী আবার স্বপ্নে আদেশ দিলেন “আমি বদ্ধ থাকতে চাইনা, আমার মন্দির নির্মাণের প্রয়োজন নেই, আমাকে তুই উন্মুক্ত অবস্থায় রাখিস, আমি উন্মুক্ত অবস্থাতেই পূজিত হতে চাই।”দেবীর কথামতো দেবীপ্রসাদ শিলার চারপাশে ইঁট দিয়ে চারপাশে মুরে দিলেন। আজোও দেবীপ্রসাদের বংশধরেরা মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ কাজে নিযুক্ত আছেন।





দেবীর মতোই ভৈরব সর্বানন্দ প্রথমে অজ্ঞাত ছিলেন। একদিন এক মহান সাধক ব্রহ্মানন্দ গিরি শ্রীহট্টে আসলেন এবং দেবীর সাধনাতে সিদ্ধ হয়েছিলেন। সেই সাধক সাধনাবলে জানতে পারলেন, দেবী মহালক্ষ্মীর পশ্চিমদিকে রয়েছে একটি টিলা এবং সেই টিলার মধ্যেই ভগবান শিব আছেন। একদিন গভীর রাতে সেই সাধক তাঁর শিষ্যদের নিয়ে সেই টিলায় উঠে জানালেন, “এই স্থানেই দেবীর ভৈরব আছেন।” কিন্তু দুঃখের বিষয়, ১২৮১ বঙ্গাব্দে সেই ভৈরব উদ্ধার করার আগেই তিনি দেহত্যাগ করেন। আচার্য শঙ্করের দশনামী সম্প্রদায়ের সাধক ব্রহ্মানন্দ গিরির এক শিষ্য ছিল, তিনিও বড় সাধক ছিলেন। তাঁর নাম ছিলো বিরজানাথ ন্যায়বাগীশ, ১২৮৬ বঙ্গাব্দের মাঘ মাসে তিনি এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলেন। স্বপ্নে তিনি দেখলেন তাঁর গুরুদেব ব্রহ্মানন্দ গিরি দুজন শিষ্যকে নিয়ে সেই শিবটিলায় উঠে বলছেন- “এখানে দেবীর ভৈরব আছেন, আমি তাঁকে প্রকাশ করবো।” মাটি খুঁড়ে শিবলিঙ্গটি দেখতে পেলেন। স্বপ্নভঙ্গহতেই বিরজানাথ দেখতে পেলেন তাঁর দুজন শিষ্য কৈলাসচন্দ্র ভট্টাচার্য ও কৃষ্ণকুমার ভট্টাচার্য বাড়ীতে এসেছেন। অলৌকিকভাবে তাঁরা দুইজনেও একই স্বপ্ন দেখেছেন এবং দুই শিষ্যই গুরুদেবকে স্বপ্নটি বৃতান্ত বললেন। গুরুদেব বিরজানাথ যখন বুঝলেন তারা তিনজনই একই রাত্রে একই স্বপ্ন দেখেছেন, তখন কালবিলম্ব না করেই গুরুদেব বিরজানাথ দুই শিষ্য সমেত সেই টিলায় উঠে মাটি খনন করতেই গৌরীপট্টসহিত শিবলিঙ্গ উঠে আসলো। এভাবে দেবীর ভৈরব প্রকট হলেন । গ্রামের লোক সব ছুটে আসলো এবংএইভাবেই শুরু হলো শিব আরাধনা।
মন্দিরে পৌঁছনোর উপায়
বাংলাদেশের সিলেট স্টেশন বা বাসস্ট্যান্ড থেকে শ্রীহট্টে এই মাতৃমন্দিরে পৌঁছনো যায়। ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে বাস বা ট্রেনে করে সিলেটে আসা যায়।