ভ্রামরী দেবী মন্দির

সত্য যুগে দক্ষ যজ্ঞে সতী শিব নিন্দা সহ্য করতে না পেরে আত্মাহুতি দেন।এর পর মহাদেব কালভৈরবকে পাঠান দক্ষকে বধ করতে।সতীর দেহ নিয়ে তিনি শুরু করেন তাণ্ডবনৃত্য ।ফলে বিষ্ণু সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ বিভিন্ন ভাগে খণ্ডিত করেন।এই অংশ গুলো যেখানে পরেছে সেখানে মন্দির তৈরি হ্যেছে।এগুলোকে সতীপীঠ বা শক্তিপীঠ বলে।এগুলি তীর্থে পরিণত হয়েছে।

পুরাণে আছে অরুণাসুর নামে এক অসুর এর আক্রমণে ধরা যখন বিপর্যস্ত তখন দেবী পার্বতী এই রূপ নেন। অরুণাসুরের বোন বজ্রজ্বালা এর দুর্মতি হল যে সে চন্দ্রদেবের রাণী হিসেবে থাকবে চিরকাল। কিন্তু চন্দ্র তার বিবাহের প্রস্তাব প্রত্যাহার করলে বোনের অপমানের শোধ নিতে অরুণাসুর ব্রহ্মার থেকে বর চায় যে কোনো দ্বিপদী বা চতুষ্পদী প্রাণী তাকে হত্যা করতে পারবে না। সে ক্রোধে দেবতাদের বন্দী করলো । বরে মত্ব হয়ে সে কৈলাসে দেবী পার্বতীকে আক্রমণ করলো তখন দেবী ভ্রামরী রূপ ধরে যুদ্ধে অগ্রগমণ করেন। ভ্রামরী শতসহস্র ভ্রমর কে পাঠালে যুদ্ধাঙ্গনে তারা অরুণাসুরকে দংশন করে ও তাকে সম্পূর্ণ ভক্ষণ করে ও তার মৃত্যু হয়।

মন্দির নিয়ে অনেক গল্প আছে। আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগে এক লাল কাপড় পরা মহারাজ এসেছিলেন মন্দিরে । তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত বিশাল জটা ছিল। তিনি দীর্ঘদিন মন্দিরে পূজা ও যজ্ঞ করেন। তিনিই তিনটি মোটা গাছের গুড়ির নিচে মায়ের পাথররূপী বাম পায়ের সন্ধান পান । এরপর দেশ বিদেশ থেকে মন্দিরে সাধুসন্তরা আসতে শুরু করে । সে সময় এখানে আসা ভক্তদের কেউ মন্দিরের একটা ম্যাপ এঁকেছিল। যা আজও ফালাকাটা স্টেশনের দেওয়ালে দেখা যায়। একবার জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার তাপস সাধ্য ও দিলীপ চৌধুরী নামে দুই অফিসার মন্দিরে এসেছিলেন । তাঁরা শালবাড়ির লোকেদের মার মহিমার কথা বলেন। এই এলাকার এক প্রবীণ নীরেন রায় একটি দুর্ঘটনায় নির্দোষ হওয়া সত্বেও মামলায় জড়িয়ে যান। মা ভ্রামরী দেবীর কৃপায় তিনি সেই মামলা থেকে মুক্তি পান । তিনি মার নতুন প্রতিমা তৈরি করে পূজা করান ও জোড়া পাঁঠা বলি দেন।

ভ্রামরী দেবী মন্দির ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার ধূপগুড়ি ব্লকের তিস্তা নদীর তীরে পুরনো শালবাড়িতে অবস্থিত । মন্দিরটি নদীর তিন স্রোতের মাঝে অবস্থান করছে বলে একে ত্রিস্রোতা বলা হয়। এই শক্তিপীঠ খুবই জাগ্রত। তবে মন্দিরটির অবস্থান সম্পর্কে অনেক গল্প প্রচলিত আছে। অনেকের মতে এই শক্তিপীঠটি জলপাইগুড়ি জেলার বোদাগঞ্জ অথবা সাতকুড়া অঞ্চলে অবস্থিত।
পীঠনির্ণয়তন্ত্র মতে দেবী সতীর বাম চরণ ত্রিস্রোতায় পতিত হয়েছিল। দেবীর নাম ভ্রামরী, ভৈরবের নাম ঈশ্বর বা জল্পেশ। দেবী ভ্রামরীও অন্যতম আদি শক্তি। ভৈরব জল্পেশ জল্পেশ মন্দিরে অবস্থান করেন।
মন্দিরটি তৈরির সঠিক সন এখনও অজানা। কারণ এটি এমন এক শক্তিপীঠ যা বহু শতাব্দী পূর্বে তৈরি হয়েছিল। মন্দির চত্বরে জোড়া বট গাছ খুব আকর্ষণীয়। এই সতীপীঠ খুব জাগ্রত। মূল মন্দিরে প্রবেশ পথে সিদ্ধিদাতা গণেশের মূর্তি আছে। মূলমন্দিরে দেবীমূর্তি রয়েছে। দেবী অলঙ্কারে ভূষিত ও অষ্টভুজা। দেবীর সামনে বড় বড় কলস আছে। কলসের উপরে পুষ্পপত্র আছে। এর পাশে আছে পিতলের দেবী চরণযুগল। যা ভক্তিভরে পূজা করা হয়। দেবীর ডানদিকে মহাদেবের মূর্তি আছে। এই কক্ষের নীচে কয়েক সিঁড়ি পরে মন্দিরের গর্ভগৃহ। দেবী সিংহবাহিনীও কৃষ্ণবর্ণা। সামনের বেদীতে রয়েছে দেবীর প্রস্তরীভূত বামপদ। শরত্‍কালে নবরাত্রির পূজা হয় মন্দিরে । দেবীর আরাধনা করতে প্রচুর ভক্ত আসে। এছাড়াও এখানে বিভিন্ন পুজো হয়। মন্দিরে দূর্গাপূজা ও মাঘী পূর্ণিমায় বিশেষ পূজা ও মেলা অনুষ্ঠিত হয়।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *