কালীক্ষেত্র আদ্যাপীঠ

চট্টগ্রাম থেকে কলকাতায় কবিরাজি পড়তে এসছিলেন অন্নদা ঠাকুর ( অন্নদাচরণ ভট্টাচার্য)। কবিরাজি পাশ করে প্র্যাকটিস করবেন এমনটাই ঠিক করেছিলেন। ইচ্ছে ছিল অসহায় দরিদ্র মানুষদের জন্য সেবা প্রতিষ্ঠান তৈরী করবেন। তবে কবিরাজির পাশাপাশি অন্নদাঠাকুর ছিলেন একজন মাতৃসাধক ও ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি, ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিষয়ে অন্নদা ঠাকুরের আগ্রহ ছিল প্রবল। ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণদেবের শিষ্য ছিলেন তিনি।

সময়টা ১৩২১ বঙ্গাব্দ (১৯১৫ সাল), এমনই সময় একদিন অন্নদা ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণদেবের স্বপ্নাদেশ পেলেন। স্বপ্নে ঠাকুর তাঁকে বললেন যে, ইডেন গার্ডেন্সের জলাশয়ে নাকি আদ্যা মা পড়ে আছেন। ওখান থেকে মাকে উঠিয়ে নিয়ে এসে প্রতিষ্ঠা করতে। অন্নদা ঠাকুরও সেই আদেশ মতো ইডেনের জলাশয়ে খোঁজাখুঁজি করে ১৮ ইঞ্চির আদ্যা মায়ের কষ্টিপাথরের বিগ্রহ পান। সেদিন ছিল রামনবমী তিথি। অন্নদাঠাকুর সেই বিগ্রহ তাঁর একজন সহকারী বন্ধু শ্রী সিদ্ধেশ্বর বসুর বাড়িতে এনে ধুমধাম করে পুজো করেন।

সেই থেকেই রামনবমী তথা বাসন্তী নবমী তিথিকে আদ্যাপীঠস্থ সকল ব্রহ্মচারীগণ এবং অগণিত ভক্তগণ আদ্যা নবমী রূপে চিহ্নিত করে থাকেন। কিন্তু সেই দিনই রাতে শ্রী শ্রী আদ্যামা অন্নদা ঠাকুরকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেন, “অন্নদা , কাল দশমী। তুমি আমায় গঙ্গায় বিসর্জন দিও”।

এই কথা শুনে অন্নদা আঁতকে উঠে বলেন, “আমার পুজোয় কি তুমি অসন্তুষ্ট হয়ে চলে যাচ্ছো মা?”

তখন দেবী বলেন, “না তা নয়। আমি শুধু শাস্ত্র বিহিত মতে পুজো পেতে চাই না। ‘মা খাও’, ‘মা পড়ো’ এমন সহজ সরল প্রাণের ভাষায় যে ভক্ত নিজের ভোগ্যবস্তু এবং ব্যবহার্য বস্তু আমাকে নিবেদন করে, সেই পুজোতে আমি বেশী খুশি হই। যদি কোনও ভক্ত আমার সামনে আদ্যাস্তোত্র পাঠ করে তাহলে আমি বিশেষ আনন্দিত হই।” এরপর মা আদ্যাস্তোত্র বলেন, আর অন্নদা ঠাকুর স্বপ্ন মধ্যেই তা লিখে যান। সেই স্তোত্রই এখনও আদ্যাপীঠে পাঠ হয় আরতির সময় ।

অবশ্য এই ঘটনার পরদিনই হইচই পড়ে যায় সেই বিগ্রহটি নিয়ে। বিগ্রহটির বয়স ও সত্যতা নিয়ে শুরু হয় নানা জল্পনা কল্পনা। কিন্তু অন্নদাঠাকুর এসবের কিছুর মধ্যেই না গিয়ে স্বপ্নাদেশ মতো সেই মূর্তি গঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে দেন। তবে শোনা যায়, বিসর্জনের আগে সরকারি তরফ থেকে ওই বিগ্রহটির ছবি তোলা হয়েছিল, সেই ছবিটিই বর্তমানে ঘরে ঘরে পূজিত।

এই ঘটনার পর প্রায় কয়েক বছর কেটে যায়। অন্নদাঠাকুর তখন আবার নিজ কবিরাজি বিদ্যায় মনোনিবেশ করেছেন। এর পাশাপাশি বহু স্থানে ঘুরে নানা অভিজ্ঞতা আয়ত্ত করছেন, সেইসঙ্গে বেশ কিছু আধ্যাত্মিক গান রচনা করেছেন।

অন্নদাঠাকুর তখন বেনারস, হরিদ্বার, মথুরা, বৃন্দাবন ইত্যাদি বিভিন্ন তীর্থস্থান ঘুরে হৃষীকেশে এসেছেন। সেখানে থাকাকালীন এক ঝুলন পূর্ণিমার রাতে পুনরায় রামকৃষ্ণদেব স্বপ্নাদেশ দিয়ে অন্নদাঠাকুরকে লছমনঝুলা যাত্রা করতে বলেন। লছমনঝুলায় এক সন্ন্যাসীর আশ্রমে ওঠেন অন্নদাঠাকুর। সেখানে রামকৃষ্ণদেব পুনরায় তাঁকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে মানুষের কল্যাণকারী কাজ করতে বলেন। বলেন , তাঁকে ২০ বছর কঠোর তপস্যা করতে হবে আর সেই সাধনার শেষে প্রতিষ্ঠা করতে হবে এক মন্দির। সেই মন্দির প্রতিষ্ঠার পর দেশে আসবে এক ধর্মীয় নবজাগরণ। ঠাকুর বলেন, সৃষ্টির পর পৃথিবীর বুকে এমন একটি মন্দির হতে চলেছে যেখানে ঈশ্বরের প্রকট আবির্ভাব ঘটবে। তাঁর মাহাত্ম্য এতটাই হবে যে মন্দির স্পর্শ করলেই ভক্তদের উদ্ধার মিলবে।

এভাবেই রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের শিষ্য অন্নদা ঠাকুরের হাত ধরে দক্ষিণেশ্বরের অদূরেই তৈরি হল দেবী আদ্যামহাশক্তির আরো এক পীঠস্থান- আদ্যাপীঠ।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, অন্নদাঠাকুর স্বপ্নে পাওয়া রামকৃষ্ণদেবের শিক্ষা ও জ্ঞান সম্পর্কে একটি বইও রচনা করেন রামকৃষ্ণমনশিক্ষা

হৃষিকেশ থেকে ফিরেই অন্নদাঠাকুর তাঁর বন্ধু ও আরো কিছু ভক্তদের সাহায্যে এবং নিজের যাবতীয় সম্পত্তি বন্ধক দিয়ে বর্তমান মন্দির স্থানে প্রথমে একটি ছোট মন্দিরগৃহ নির্মাণ করেন। সেই শুরু। এরপর ২০ বছরের কঠোর সাধন ২ বছরে শেষ করে অন্নদাঠাকুর ১৩২৮ বঙ্গাব্দে রামকৃষ্ণদেবের কথামতো তৈরি করেন দক্ষিণেশ্বর রামকৃষ্ণ সংঘ। ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে নিজের জটা প্রোথিত করে মন্দিরের ভিত নির্মাণ শুরু করেন।

এরপর ১৩৪০ বঙ্গাব্দ থেকে দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে শিল্পীদের অসামান্য হাতের যাদুতে ১৩৭৫ বঙ্গাব্দের মকর সংক্রান্তিতে অন্নদা ঠাকুর স্বপ্নে দেখা মন্দিরটি গড়ে ওঠে । ১০ কাঠা জমির উপর ৯৬ ফুট উঁচু বিশাল মন্দির হল দেবীর। মন্দিরটি নির্মাণ করতে খরচ হয়েছিল তৎকালীন ১০ লক্ষ টাকা। মন্দিরটির স্থাপত্যও অনবদ্য। বাংলার অন্যান্য মন্দিরের থেকে এই মন্দিরের গঠনশৈলী যেমন বিরল, ঠিক তেমনই অভিনব এর আঙ্গিক। দূর থেকে দেখে মনে হতেই পারে সামনা সামনি ৩ টি মন্দির যেন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রয়েছে।

মন্দিরের চূড়ো ৩ টিও যেন ধাপে ধাপে নেমেছে। যা দূর থেকে দেখলে মনে হবে একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে। মূল মন্দিরের নির্মাণেও রয়েছে বৈচিত্র্যের ছোঁয়া। মন্দিরের চূড়ায় সর্ব ধর্মের প্রতীক ব্যবহৃত হয়েছে। আছে হিন্দু ধর্মের ত্রিশুল, বৌদ্ধ ধর্মের পাখা, খ্রীষ্ট ধর্মের ক্রুশ এবং ইসলাম ধর্মের চাঁদ-তারা। জনশ্রুতি এই যে, এমন ত্রিরত্ন-বিশিষ্ট মন্দিরের ভাবনাও অন্নদাঠাকুরের শ্রী রামকৃষ্ণদেবের স্বপ্নাদেশ অনুযায়ীই। কেননা- দেবী যে সর্বজনীন, তিনি তো সবার মা।

তবে শ্রী শ্রী ঠাকুরের নির্দেশ ছিল, বারো বছরের মধ্যে মন্দির নির্মাণ সম্পূর্ণ হলে, তবেই মন্দিরে সাধারণের প্রবেশ অবাধ থাকবে, নয়তো নয়। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। তাই মূল মন্দিরে ভক্তরা প্রবেশ করতে পারে না। সামনের নাট মন্দির থেকেই দর্শন করতে হয় দেবীকে।

মন্দিরটির যেমন অভিনবত্ব আছে, ঠিক তেমনই অভিনব দেবমূর্তি। কারুকার্য করা শ্বেত পাথরের ত্রিরত্ন বেদী বা তিন ধাপের বেদির প্রথম রত্নে বা ধাপে অধিষ্ঠিত ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব, বেদীতে লেখা ‘গুরু’।

দ্বিতীয় রত্ন তথা ধাপে আদ্যা মায়ের বিগ্রহ (অন্নদাঠাকুর স্বপ্নে পাওয়া বিগ্রহটির অনুরূপ একটি বিগ্রহ নির্মাণ করেন)। মহাদেবের বুকের ওপর দণ্ডায়মান দেবী আদ্যাশক্তি চতুর্ভূজা। ডান দিকের দুটি হাতে যথাক্রমে বর ও অভয় মুদ্রা। বাম হাতদুটির একটিতে তলোয়ার ও একটিতে নরমুণ্ডের মালা এবং মায়ের বেদীতে লেখা ‘জ্ঞান ও কর্ম’।
সর্বোপরি, তৃতীয় রত্ন বা ধাপে রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তি, বেদীতে লেখা ‘প্রেম’।

কথিত যে, হৃষীকেশে থাকাকালীন অন্নদাঠাকুর রাধাকৃষ্ণ এবং আদ্যা মায়ের প্রতিরূপ দেখতে পেয়েছিলেন দুটি স্থানীয় পাহাড়ি শিশুর মধ্যে, তাই একই সাথে বৈষ্ণব এবং শাক্ত- এমন অভিনব বিগ্রহ কেবল আদ্যাপীঠ মন্দিরেই দেখা যায় । উল্লেখ্য, সেবায়েত বা পূজারি ছাড়া দ্বিতীয় কেউ মন্দিরে প্রবেশ করতে পারেন না। দেবদর্শন করতে হয় সামনের নাটমন্দির থেকেই।

প্রতিদিন সূর্যোদয়ের একঘন্টা আগে মঙ্গলারতি, সকাল সাড়ে ১০ টায় ভোগারতি আর সূর্যাস্তের দেড় ঘন্টা পর শীতলারতি অনুষ্ঠিত হয় মন্দিরে। এই মন্দিরের ভোগেও বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

প্রত্যহ রাধাকৃষ্ণের জন্য সাড়ে বত্রিশ সের চালের ভোগ রান্না হয়। দেবীর জন্য হয় সাড়ে বাইশ সের চালের ভোগ এবং রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জন্য বরাদ্দ সাড়ে বারো সের চালের ভোগ। এছাড়াও প্রত্যহ জনসাধারণের জন্য অন্নভোগের প্রচলন আছে মন্দিরে।
শুধু মাত্র দুপুর ও সন্ধ্যায় আরতির সময়ই দেবী দর্শনের জন্য মন্দিরের দরজা খুলে দেওয়া হয়। এছাড়া দিনের অন্যান্য কোন সময়ই দর্শন পাওয়া যায় না, বাকি সব সময় মন্দিরের দরজা বন্ধ থাকে।

তবে বছরে ৩৬৫ দিনের মধ্যে মোট ৫২ দিন সর্বসাধারনের জন্য সারাদিন মন্দিরের দরজা খোলা থাকে। শুধুমাত্র এই বিশেষ দিনগুলোতেই সারাদিন মায়ের দর্শন মেলে। এই বিশেষ দিনগুলি হল—

▪︎ প্রতিমাসে শুক্লপক্ষের নবমী, কৃষ্ণপক্ষের একাদশী এবং সংক্রান্তি ছাড়া নাগপঞ্চমী, ঝুলন পূর্ণিমা, জন্মাষ্টমী, রাধাষ্টমী, মহালয়া, দুর্গাসপ্তমী থেকে বিজয়া দশমী, কোজাগরী পূর্ণিমা, দীপান্বিতা অমাবস্যা, রাস পূর্ণিমা, শ্রীপঞ্চমী, দোলপূর্ণিমা, বাসন্তী সপ্তমী, অন্নপূর্ণা অষ্টমী, আদ্যানবমী (রামনবমী), বাসন্তী দশমী।

মন্দিরের পশ্চিম দিকে প্রাচীনকালের ৬টি আটচালা শিবমন্দির আছে। উল্টো দিকে আছে আরো একটি শিবের মন্দির। সেই মন্দিরে প্রতিদিনই পুজো হয়। এছাড়াও শ্রী অন্নদা ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ সংঘ মন্দির ( এখানে দুর্গা পূজা, জগদ্ধাত্রী পূজা, রথযাত্রা প্রভৃতি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়), অনাথ বালিকাদের জন্য আশ্রম, আশ্রয়হীন মায়েদের জন্য মাতৃ আশ্রম, দাতব্য চিকিৎসালয়, রামকৃষ্ণ সেবা প্রতিষ্ঠান, বিদ্যালয়, সংস্কৃত মহাবিদ্যালয় ছাড়াও এখানে নানা সমাজকল্যানমূলক কাজ করা হয়। মূলত কৃষিকেন্দ্রের উপার্জনেই মন্দির তথা সঙ্ঘের বিভিন্ন কাজকর্ম চলে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *